বদলটা এলো ধীরে ধীরে। এতটাই ধীরে যে প্রথমে কেউ বুঝতে পারিনি।
যারা একটু বেশি সাহসী ছিল, একটু বেশি প্রশ্ন করত, একটু বেশি হাসত — তারা একে একে নেই হয়ে গেল। কোনো বিদায় নেই, কোনো চিহ্ন নেই।
রনিও একদিন নেই।
আমরা খোঁজ করলাম। যারা রয়ে গিয়েছিল তারা বলল, "ঢাকায় চাকরি পেয়েছে।" আট বছরের ছেলে ঢাকায় চাকরি পেয়েছে — এই কথাটা আমাদের মুখে আটকে থাকল, কিন্তু কেউ জোরে বলল না।
কারণ কেউ শুনতে চাইত না।
জীবন অনেক দূরে নিয়ে গেছে। শহর বদলেছে, পেশা বদলেছে, মানুষ বদলেছে। সেই কলেজের দিনগুলো মাঝে মাঝে স্বপ্নের মতো মনে হয় ।
কাজের সূত্রে একটা অপরিচিত শহরে যেতে হল। বাজারের ভিড়ে হাঁটছিলাম, হঠাৎ একটা চেহারায় চোখ আটকে গেল।
তাকে ঘিরে আছে কয়েকজন। তার চারপাশে একটা অদৃশ্য দূরত্ব — যেটা মানুষ তৈরি করে ভয় থেকে। বাজারের লোকেরা চোখ নামিয়ে হাঁটছে।
আমি চিনতে পারলাম।
রনি।
কিন্তু রনির চোখে যে আলো ছিল — সেটা নেই। সেখানে এখন অন্য কিছু। এমন একটা দৃষ্টি যেটা মানুষ তখনই পায় যখন অনেক কিছু হারিয়ে ফেলে, অথবা যখন কেউ তার ভেতর থেকে অনেক কিছু কেড়ে নেয়।
আমি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম। ভিড় আমাকে ঠেলে এগিয়ে যাচ্ছিল, কিন্তু আমার পা সরছিল না।
সেদিন প্রথমবারের মতো পুরো চিত্রটা দেখলাম।
ওরা হারায়নি। ওদের হারিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এই দেশে কিছু মানুষ আছে যারা ক্ষমতার আড়ালে থেকে এই কাজটা করে —যাদের খোঁজ নেবে না কেউ, তাদের তুলে নিয়ে ব্যবহার করে। অপরাধে, নিষ্ঠুরতায়, অন্ধকারে। কারণ এই শিশুরা কাগজে নেই, রেজিস্ট্রিতে নেই, কোনো ঠিকানায় নেই। এরা হারিয়ে গেলে কেউ মামলা করে না।
আমি যা বলতে চাই
আমি জানি রনিকে আমি ফেরাতে পারব না। আমি জানি সেই হারানো মুখগুলো আর ফিরে আসবে না।
কিন্তু আমি এটাও জানি — পথশিশুদের দেখে দয়া না করে, তাদের রেজিস্ট্রেশন করা দরকার। নাম দরকার, ঠিকানা দরকার, রেকর্ড দরকার। যাতে তারা হারিয়ে গেলে কেউ জিজ্ঞেস করতে পারে — কোথায় গেল?
আজও রাস্তায় হাঁটলে সেই চোখগুলো দেখি। ছোট ছোট হাত, বড় বড় প্রশ্ন।
সবাইকে বাঁচানো হয়তো সম্ভব না। কিন্তু একটা শিশুর নাম জানা — এটুকু কি আমরা করতে পারি না?
-Safi | Neopreneur
Comments
No comments yet. Be first.
Please log in to comment.