হারিয়ে যাওয়া হাতগুলো (অংশ-১)

হারিয়ে যাওয়া হাতগুলো (অংশ-১)

শহরের রাস্তাগুলো আমার কাছে অনেক দিন শুধু যাতায়াতের পথ ছিল। কলেজে পড়ার সময়, সকালে বেরিয়ে সন্ধ্যায় ফিরতাম — মাঝখানের ঘণ্টাগুলো কোথায় কাটতো সেটা নিয়ে কোনো হিসাব ছিল না। কিন্তু একটা মুহূর্ত আসে যখন চোখ খুলে যায়। আমার সেই মুহূর্তটা এলো একটা বাচ্চার হাতের দিকে তাকিয়ে।
হাতটা ছোট, কালো ধুলোয় মাখা। একটা সিগন্যালে আটকে থাকা গাড়ির কাঁচে সে টোকা দিচ্ছিল — আস্তে, বারবার, যেন সে জানে জোরে দিলে গাড়িটা চলে যাবে। কাঁচের ওপারে যে বসেছিল সে একবারও তাকাল না।

পথশিশু — শব্দটা পেপারে পড়েছিলাম। কিন্তু তখন বুঝিনি যে প্রতিদিন সকালে ফুটপাথের ধুলো ঝেড়ে উঠে দাঁড়ানো একটা মানুষের জীবন কতটা ভিন্ন হতে পারে। তারা আমাদের শহরের একটা অদৃশ্য স্তরে বাস করত — সবার সামনে, কিন্তু কারও দৃষ্টিতে নয়।
আমার বন্ধু রাফি একদিন বলল, "তুই কি জানিস এই বাচ্চাগুলোকে কেউ নাম ধরে ডাকে না?" আমি জানতাম না। রাফি জানত — কারণ সে এই শহরেই বড় হয়েছে, চোখ খোলা রেখে।
আমরা কয়েকজন বন্ধু মিলে ঠিক করলাম — সাহায্য মানে টাকা ছুঁড়ে দেওয়া নয়। সাহায্য মানে একটা জায়গা তৈরি করা যেখান থেকে কেউ নিজে দাঁড়াতে পারে।

শুরুটা ছিল সামান্য। কেউ কে চা বিক্রি, কেউ কে বাদাম বিক্রি, কেউ বাসস্ট্যান্ডে চানাচুরের ঝুড়ি নিয়ে দাঁড় করালাম । পুঁজি কম, কিন্তু কাজে লাগানোর আনন্দ ছিল মনে।
তাদের মধ্যে একজন ছিল — আমি তাকে রনি বলে ডাকতাম। বয়স আট কি নয় হবে, কিন্তু চোখে এমন একটা আলো যেটা বড়দের মধ্যেও বিরল। সে বাদাম বিক্রি করত, প্রতিদিন হিসাব রাখত কতটুকু বিক্রি হলো, কতটুকু বাকি রইল। আমরা মাঝে মাঝে বসে চা খেতাম একসাথে — সে কথা বলত ভবিষ্যতের, কী হতে চায়, কোথায় যেতে চায়।
হাজারের মধ্যে মাত্র চার-পাঁচজন। কিন্তু তখন মনে হত, এই চার-পাঁচজনই যথেষ্ট।

একটু বড় স্বপ্ন দেখার চেষ্টা করলাম। এলাকার প্রভাবশালী মানুষদের দরজায় গেলাম — যাদের বাড়িতে বড় বড় সোফা, দেয়ালে দামি ছবি, গেটে সিকিউরিটি।
একজন বললেন, "এই সমস্যা কোনোদিন শেষ হবে না।"
আরেকজন বললেন, "সরকারের কাজ এটা।"
সমাজসেবকরা মাথা নাড়লেন, নোটবুকে কিছু লিখলেন, বললেন ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিছুদিন পর শুনলাম বিষয়টা নাকি একজন রাজনীতিবিদের টেবিলে গেছে।
আমরা অপেক্ষা করলাম।

 -Safi | Neopreneur

Comments

No comments yet. Be first.

Please log in to comment.